বিমান ভাড়া কমার সুখবর সাময়িক
আপলোড সময় :
০৪-০৪-২০২৫ ১১:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
০৪-০৪-২০২৫ ১১:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন
সৌদি আরবগামী ফ্লাইটসহ বিভিন্ন গন্তব্যে বিমান ভাড়া ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছেÑআটাবের এমন দাবিকে ‘সাময়িক সুখবর এবং আইওয়াশ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞ ও এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এয়ার টিকেটের গ্রুপ বুকিং, সিন্ডিকেট, অন্যায্য মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে। মনিটরিং করা হচ্ছে। যা আগে কখনো করা হয়নি। এটি ভালো উদ্যোগ। নিয়মিত মনিটরিং করা হলে এর সুফল পাওয়া যাবে। তবে সরকারি পদক্ষেপের কারণে ভাড়া ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, এটি সঠিক নয়। এটি এখনই বলা যাবে না। ওমরাহর ভিসা না পাওয়া এবং ঈদে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার টিকেটের চাহিদা না থাকায় ভাড়া কমেছে। চলতি মাস এবং মে মাসে টিকেটের চাহিদা বাড়লে দামও বাড়বে। টিকেটের দাম কমানোর জন্য ফ্লাইট বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন অতিরিক্ত চার্জ কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
আকাশপথের যাত্রায় টিকেটের উচ্চমূল্য কমানো ও এ খাতে শৃঙ্খলা আনতে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় গত ১১ ফেব্রুয়ারি ১০ দফা নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করে। এতে টিকেট বুকিংয়ের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তা বরাদ্দ করা না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বুকিং বাতিল করতে বলা হয়। পাশাপাশি গ্রুপ বুকিংয়ের নামে কোনো এয়ারলাইন্সের অনেক টিকেট একসঙ্গে ব্লক করা হলে পরে সাত দিনের মধ্যে যাত্রীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বরসহ তা বিক্রি নিশ্চিত করার তথ্য দিতে বলা হয়। তা না হলে পরের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সেসব টিকেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করতে হবে এয়ারলাইন্সকে।
যাত্রীর নাম, পাসপোর্টের বিবরণ ও পাসপোর্টের ফটোকপি দিয়ে টিকেট বুকিংয়ের নির্দেশনার ফলে যেসব টিকেট নাম ছাড়া ‘ব্লক’ করে রাখা হতো সেগুলো এয়ারলাইন্সগুলো ‘ওপেন’ করে দেয়। ফলে কম্পিউটার রিজারভেশন সিস্টেমে সিট সহজলভ্য হয়ে যায়। এতে এখন ট্রাভেল এজেন্সি ও যাত্রীরা ফ্লাইটে সিট খালি আছে কি না এবং কত ভাড়া তা অনলাইনে দেখতে পান। সব দেখেশুনে চাহিদা মতো টিকেট বুকিং করতে পারেন যাত্রী এবং এজেন্সিগুলো।
গত ১৯ মার্চ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আটাব জানিয়েছে, গত ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারিতে যাত্রীদের ঢাকা থেকে সৌদি আরবের প্রধান শহরগুলোতে যেতে উড়োজাহাজের টিকেটে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। গ্রুপ বুকিং স্কিমের অধীনে টিকেটের দাম ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল। তবে সরকারের নজরদারি ও প্রচেষ্টায় টিকেটের দাম নাটকীয়ভাবে কমেছে। এখন ভাড়া ৫০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। এমনকি কয়েকটি এয়ারলাইন্স ঢাকা থেকে দাম্মাম ও রিয়াদের মতো রুটে টিকেট ভাড়া কমিয়ে ৩৫ হাজার টাকায় দিচ্ছে। সরকারি নির্দেশনার ফলে টিকেট ‘ব্লক’ করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর যে ধারা চলছিল তা বন্ধ হওয়ার ফলে এই পরিবর্তন এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এয়ার টিকেটের মার্কেট যেন বিদেশিদের হাতে চলে না যায় সে জন্য সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে বিমান ভাড়া কমেছে, এটি ভুয়া খবর। ওমরাহর জন্য সৌদির ভিসা পাওয়া যায়নি। যারা টিকেট কেটেছে তারা ফেরত দিয়েছে। চাহিদা ছিল না। ঈদের আগে বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার সংখ্যা ছিল খুবই কম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ঈদ উদযাপন করতে আসা যাত্রীর সংখ্যা বেশি ছিল। চাহিদা না থাকায় টিকেটের দাম কমেছে। আসার ভাড়া কিন্তু বেশি। অথচ আটাব এটিকে সরকারের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার কারণে হয়েছে বলে দাবি করেছে, সরকারকে খুশি করার জন্য করেছে। এপ্রিল মে মাসে এই ভাড়া বেড়ে যাবে। তিনি দাবি করেন, এর ফলে পুরো মার্কেট বিদেশিদের হাতে চলে যাবে। বলা হয়েছে, এখান থেকে গ্রুপ টিকেট বিক্রি করা যাবে না। দুবাই, সিঙ্গাপুর থেকে বিক্রি করবে। সেটি কীভাবে ঠেকাবে?
বড় এয়ারলাইন্সগুলো আইন মানবে কিন্তু বাজেট ক্যারিয়ারগুলো সালাম এয়ার, ফ্লাই দুবাই, জাজিরা, ইনডিগো এরা ফেয়ারটাকে ম্যানিপুলেট করে। তারা গ্রুপ টিকেট বিক্রি করে বসে থাকে। কিছু এজেন্সি সেগুলো ইচ্ছেমতো বিক্রি করে। এই সিন্ডিকেটের সবার দুবাইতে অফিস আছে। তারা দুবাই থেকে বিক্রি করবে। সেলটা আগে দেশের মধ্যে হতো এখন বাইরে থেকে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটির সুফল পাওয়া যাবে না।
পাশের দেশে টিকেটের দাম কম, এ বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের তো চাহিদা কম। আমাদের এখানে টিকেটের দাম বেশি ৫টি কারণে। ফুয়েলের দাম, গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং চার্জ, পার্কিং-ল্যান্ডিং চার্জ বেশি, সব এয়ারলাইন্স সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছে। ডোমেস্টিকে ভাড়া ৩ হাজার টাকা এর মধ্যে ট্যাক্স ১ হাজার ১০০ টাকা। বিমান ভাড়ার মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই হচ্ছে ভ্যাট-ট্যাক্সসহ নানা খরচ। সারা পৃথিবীতে কোথাও বিমান ভাড়ার ওপর ট্যাক্স নেই। এয়ারলাইন্স সার্ভিসের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। বিমান গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সার্ভিস ঠিকমতো দেয় না। একটা স্টাফ দেওয়া হয়। ফলে ১০ জন স্টাফ রাখা হয়। এর খরচ এয়ারলাইন্সগুলো টিকেট থেকে তুলে নেয়। ডলারের কারণে মূল্যস্ফীতি হচ্ছে। এসব বেসিক জায়গায় হাত দেওয়া হচ্ছে না। আটাব এজেন্সিদের কাছ থেকে ভালো সাজার জন্য এগুলো করছে।
আটাবের সাবেক সভাপতি মনজুর মোরশেদ বলেন, ভাড়া ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যাত্রীই তো নেই। ভাড়া কমেছে না বেড়েছে তা বোঝা যাবে যখন চাহিদা বাড়বে তখন। এখন ওমরাহ ভিসা দিচ্ছে না। এমপ্লয়মেন্ট ভিসাও সেভাবে দিচ্ছে না। শুধু সৌদি আরব নিয়ে তো আর গ্লোবাল মার্কেট না। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার অন্যান্য ডেস্টিনেশন নিয়ে গ্লোবাল মার্কেট সেগুলো এভারেজ হিসাব করলে ভাড়া খুব একটা কমেছে বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ভাড়া কমানোর জন্য এয়ারলাইন্সগুলোকে তাদের ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক রাখতে হবে। সিভিল এভিয়েশন অথরিটি যথাযথ পদক্ষেপ নিলে ভাড়া বাড়াতে পারবে না।
ট্যুর অপারেটস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয় মনিটরিং সেল করায় এভারেজে কয়েকটি সেক্টরে ভাড়া কমেছে। এখন তারা যদি ঠিকমতো মনিটরিং করে তা হলে কুরবানিসহ চাহিদার সময়ে বোঝা যাবে ভাড়া কতটুকু কমেছে। তিনি বলেন, গ্রুপ টিকেট বন্ধ হলে ভাড়া কমবে। কিন্তু বিদেশ থেকে গ্রুপ টিকেট বুকিং দিলে আমাদের কিছু করার থাকবে না। মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং আগে ছিল না, আটাব-টোয়াব সহযোগিতা করছে। সন্দেহভাজন ট্রাভেল এজেন্সিকে মন্ত্রণালয় এবং এনবিআর ডেকেছিল। কয়েক দিন গেলে এটির রেজাল্ট পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, থার্ড টার্মিনাল হলে ফ্লাইট বাড়বে। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ ও ডলারসহ নানা কারণে ভাড়া বেশি। এগুলো নিয়ে সরকার কাজ করছে। মনিটরিং কন্টিনিউ থাকলে রেজাল্ট পাওয়া যাবে। জনপ্রিয় ডেস্টিনেশনে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ালে ভাড়া কমবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : mainadmin
কমেন্ট বক্স